ঢাকা | বঙ্গাব্দ

তেলের লাইন বাড়াচ্ছে যানজট, জনভোগান্তি চরমে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Apr 16, 2026 ইং
তেলের লাইন বাড়াচ্ছে যানজট, জনভোগান্তি চরমে ছবির ক্যাপশন:
ad728
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর ঢাকায় যানজট এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান সড়কগুলোয় ধীরগতি আর দীর্ঘ অপেক্ষা স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।  এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট নিরসনে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা খুব একটা দৃশ্যমান নয়। বরং বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অনিয়ন্ত্রিত সড়ক ব্যবহার এবং দায়িত্বহীন আচরণের কারণেই এসব উদ্যোগ বারবার থমকে যাচ্ছে।কার সড়কে গণপরিবহনের শৃঙ্খলাহীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বাসচালকরা নিয়ম উপেক্ষা করে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছেন, সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচলে লেন মানছে না। একই সঙ্গে যাত্রীরাও নির্ধারিত স্টপেজ ব্যবহারে অভ্যস্ত নন; রাস্তার যেকোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে বাস থামানো এখন সাধারণ দৃশ্য। এসব মিলিয়ে শহরের যানজট যেন এক অনিয়ন্ত্রিত চক্রে আটকে আছে।

এরই মধ্যে পরিস্থিতিকে নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে জ্বালানি সংকট। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা-সংঘাতের প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সারি, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে প্রাইভেট কার ও বাইক চালকদের। সড়কের একাংশ জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তেলের লাইনে যুক্ত হচ্ছে শত শত যানবাহন, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের প্রতিটি মোড়ে। এই লাইনগুলো সরাসরি সড়কের অংশ দখল করে ফেলায় যান চলাচল আরও সীমিত হয়ে পড়ছে এবং আগের চেয়ে দীর্ঘ হচ্ছে যানজট। ফলে কর্মজীবী মানুষ সময়মতো পৌঁছাতে পারছেন না কর্মস্থলে, শিক্ষার্থীরা আটকে পড়ছে সড়কে, জরুরি সেবাও পড়ছে বিলম্বের মুখে। ভোগান্তির মাত্রাও চরমে পৌঁছেছে।


তেলের জন্য লাইন ও ট্রাফিক ব্যবস্থা
রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও পয়েন্টে জ্বালানি সংকটকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি এখন সরাসরি ট্রাফিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে ডেমরা, যাত্রাবাড়ি, মতিঝিল, গুলিস্তান, শাহবাগ, মহাখালী, মিরপুর, তেজগাঁও, খিলক্ষেত ও উত্তরা; প্রায় প্রতিটি এলাকায় ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক দীর্ঘ যানবাহনের সারি নতুন করে তীব্র যানজটের জন্ম দিচ্ছে।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে ভোর, কোনো কোনো সময় রাত থেকে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে সংখ্যায় অল্প হলেও আছে বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান। অনেক ক্ষেত্রে এই সারি মূল সড়ক ছাড়িয়ে পাশের লেন দখল করে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও লাইনের দৈর্ঘ্য এক থেকে দুই কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা সরাসরি যান চলাচলের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।বিশেষ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও মহাখালী-সংলগ্ন এলাকায় পরিস্থিতি বেশি জটিল। এখানে ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি নিতে অপেক্ষমাণ গণপরিবহন সড়কের একটি বড় অংশ দখল করে রাখছে। ফলে স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করতে পারছে না অন্য যানবাহন। ধীরগতির এই চাপ দ্রুতই দীর্ঘ যানজটে রূপ নিচ্ছে এবং আশপাশের সড়কগুলোতেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে।একই চিত্র গুলিস্তান ও মতিঝিল এলাকার মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতেও দেখা গেছে। অফিস সময়কে কেন্দ্র করে যখন সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ে, তখন ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির সারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে করে কয়েকশ মিটার এলাকার যানজট দ্রুত কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।খিলক্ষেতের ফিলিং স্টেশনের লাইন ঠেকে যাচ্ছে জিয়া কলোনি পর্যন্ত। আবার তেজগাঁওয়ের একটি ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইন প্রধানমন্ত্রীর অফিস ছড়িয়ে চলে যাচ্ছে মহাখালী ফ্লাইওভার পর্যন্ত। ফলে বিমানবন্দর হয়ে উত্তরার দিকে যেতে সময় লাগছে বেশি। অন্যদিকে মহাখালী থেকে ফার্মগেটের দিকে যেতেও পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার কারণে বাসের দৈনিক ট্রিপ কমে যাচ্ছে। এতে সড়কে চলাচলরত বাসের সংখ্যা সাময়িকভাবে কমে গেলেও যেসব বাস লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, সেগুলোই উল্টো সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে যানজট কমার পরিবর্তে আরও দীর্ঘ হচ্ছে। যাত্রীরাও পড়ছেন দ্বিমুখী ভোগান্তিতে। একদিকে পর্যাপ্ত গণপরিবহন না পেয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে যে বাসগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোও যানজটে আটকে থাকায় গন্তব্যে পৌঁছাতে লাগছে কয়েকগুণ বেশি সময়। জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষও পড়ছেন একই পরিস্থিতিতে।ট্রাফিক সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিং স্টেশন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব এবং সড়ক ব্যবহারে শৃঙ্খলার ঘাটতি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। নির্দিষ্ট লেন বা আলাদা সারি ব্যবস্থাপনা না থাকায় জ্বালানির জন্য অপেক্ষমাণ যানবাহন সরাসরি মূল সড়কে প্রভাব ফেলছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য-অভিযোগ
জ্বালানি সংকট ঘিরে সড়কে সৃষ্ট দীর্ঘ যানজটের জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে ট্রাফিক সদস্যদের কার্যকর উপস্থিতি না থাকায় ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক এই অরাজকতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

মহাখালী এলাকায় কর্মজীবী এক যাত্রী বলেন, সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য বাসে উঠি, কিন্তু ফিলিং স্টেশনের লাইনে বাস দাঁড়িয়ে থাকে প্রায় এক ঘণ্টা। আশপাশে কোনো ট্রাফিক পুলিশকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে দেখি না। সবাই নিজের মতো করে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখে, এতে পুরো সড়ক বন্ধ হয়ে যায়।একই ধরনের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন খিলক্ষেত এলাকার বাসিন্দা এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, প্রতিদিনই ক্লাসে যেতে দেরি হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনের সামনে গাড়ির লাইন এমনভাবে থাকে যে কোনটা রাস্তা আর কোনটা লাইন বোঝার উপায় থাকে না। ট্রাফিক পুলিশ থাকলেও তারা অনেক সময় শুধু দাঁড়িয়ে থাকে, সক্রিয়ভাবে কিছু করতে দেখা যায় না।যাত্রাবাড়ি এলাকার এক পরিবহন চালক জানান, জ্বালানি তেলের জন্য আগেও লাইন ছিল। এখনও আছে। তবে এবার বেশি। ট্রাফিক সদস্যরা যদি আমাদের সঠিকভাবে গাইড করতো, তাহলে এত জট হতো না।মিরপুর এলাকার এক পথচারীর ভাষ্য, রাস্তা পার হতে গেলেও ভয় লাগে। গাড়িগুলো এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, কোনো শৃঙ্খলা নেই। ট্রাফিক পুলিশকে অনেক সময় দেখাই যায় না, আর থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা খুব একটা চোখে পড়ে না।গুলশান-বনানী এলাকার ব্যবসায়ীরাও একই অভিযোগ তুলেছেন। তাদের মতে, এই জ্যামের কারণে ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পণ্য আনা-নেওয়া দেরি হচ্ছে, ক্রেতারাও ঠিকমতো আসতে পারছে না। অথচ প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। একই ধরনের কথা বলেছেন পুরান ঢাকা, গুলিস্তান ও মতিঝিলের ব্যবসায়ীরা।

bn24
খিলক্ষেতের একটি ফিলিং স্টেশনের কারণে সৃষ্ট দীর্ঘ যানজট ঠেকেছে ক্যান্টনমেন্ট ফ্লাইওভারে। 

সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও অনিয়ম
রাজধানীর চলমান যানজট পরিস্থিতির জন্য গণপরিবহন সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও অনিয়মকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সড়কে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার পেছনে বাসচালক ও পরিবহন মালিকদের দায়িত্বহীন আচরণই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন নগর বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়কের ধারে বাস পার্কিং। বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, যাত্রী তোলার অপেক্ষায় বা নির্ধারিত ট্রিপের সময় না হওয়া পর্যন্ত বাসগুলো রাস্তার একপাশে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকে। এতে করে সড়কের কার্যকর লেন সংখ্যা কমে যায়। একাধিক বাস পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পড়লে পুরো লেনই কার্যত অচল হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে মোটরসাইকেল চালকদের কারণেও সড়কের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে পড়ছে।  
মহাখালী ও খিলক্ষেত এলাকায় এই চিত্র আরও স্পষ্ট। এখানে বাসগুলো প্রায়শই ফিলিং স্টেশন বা স্ট্যান্ডের বাইরে সড়কের ওপরই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে স্বাভাবিক যান চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। মোটরসাইকেলের লাইন এত বেশি, সড়কে হাঁটাচলার মতো উপায় থাকে না।পরিবহন সংশ্লিষ্টদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো লেন শৃঙ্খলা না মানা। নির্ধারিত লেনে চলাচল না করে যত্রতত্র গাড়ি ঢোকানো, ওভারটেকের জন্য হঠাৎ দিক পরিবর্তন কিংবা সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতা সড়কে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। এতে করে একটি স্বাভাবিক গতির ট্রাফিকও দ্রুত অচল অবস্থায় চলে যাচ্ছে। তাছাড়া, নির্ধারিত বাসস্টপ উপেক্ষা করে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় হঠাৎ করে লেন পরিবর্তন, সড়কের মাঝখানে থামা কিংবা বিপরীত দিক থেকেও গাড়ি ঢোকানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা প্রতিনিয়তই ঘটছে।

bn24
খিলক্ষেতের একটি ফিলিং স্টেশনের কারণে সৃষ্ট দীর্ঘ যানজট ঠেকেছে ক্যান্টনমেন্ট ফ্লাইওভারে। 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রস্তাবনা
এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর জ্বালানি সংকট, দীর্ঘ যানজট ও অনিরাপদ যাতায়াত— এই তিনটি সমস্যা এখন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী যাত্রীদের মতে, সমস্যার সমাধানও তাই আলাদা করে নয়, সমন্বিতভাবেই করতে হবে। তারা কয়েকটি দাবি ও প্রস্তাবনা দিয়েছেন; এতে গুরুত্ব দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
ঢাকা ইম্পিরিয়াল কলেজের প্রভাষক ফয়সাল বার্ক বাংলানিউজকে বলেন, ফিলিং স্টেশনগুলোয় আলাদা লেন করে দিলে বড় সমস্যা কমে যাবে। এখন যেভাবে বাস-ট্রাক মূল সড়ক দখল করে লাইনে দাঁড়ায়, সেটাই জ্যামের বড় কারণ। সরকার চাইলে নির্দিষ্ট সময় ভাগ করে ভারী যানবাহনের জন্য আলাদা স্লট করতে পারে। তবে তার আগে দরকার ট্রাফিকের দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা। শুধু দাঁড়িয়ে থাকলে হবে না, কোথায় লাইন হবে, কোথায় হবে না এটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিশেষ করে ফিলিং স্টেশনের সামনে যেন কোনোভাবেই মূল সড়ক বন্ধ না হয়।রাজধানীর স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী তাসমিন আক্তার মিম বলেন, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা না থাকলে কোনো কিছুই ঠিক হবে না। বাসগুলো স্টপেজ ছাড়া কোথাও দাঁড়াতে পারবে না, এই নিয়মটা কঠোরভাবে মানাতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদেরও সচেতন করতে হবে, যেন তারা যত্রতত্র ওঠানামা না করেন।মিরপুর-১ নম্বরের মাজার কো-অপারেটিভ মার্কেটের সাবেক সভাপতি নাসির উদ্দিন ভুঁইয়া বলেন, সরকার যদি নিয়ম করে দেয়, কিন্তু বাস্তবে তা মানানো না হয়, তাহলে কোনো লাভ নেই। নিয়মের পাশাপাশি নজরদারি বাড়াতে হবে। যারা সড়ক দখল করে রাখে বা নিয়ম ভাঙে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্বরত বাসচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি সংকটজনিত এই পরিস্থিতিতে তারাও কম ভোগান্তিতে নেই। একদিকে যানবাহন সচল রাখতে জ্বালানি নেওয়া বাধ্যতামূলক, অন্যদিকে ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ালেই সড়কে তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ; এই দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন তারাও। অছিম পরিবহনের চালক মোস্তফা বলেন, তেল না নিলে গাড়ি চালানো সম্ভব না। আবার লাইনে দাঁড়াইলেও রাস্তা বন্ধ হইয়া যায়। যাত্রীরা আমাগো লগে চিল্লাচিল্লি করে। আমাগো তো কিছু করার থাকে না। দিশারী পরিবহনের চালক আব্বাস তালুকদার বলেন, একবার লাইনে ঢুকলে কখন তেল পাওয়া যাইবো কোনো নিশ্চয়তা নাই। আমাগো গাড়ি বন্ধ কইরা বইসা থাকতে হয়। রাস্তায় চাপ বাড়ে বুঝতাসি, কিন্তু আমাগো আয়ও তো কইমা গেছে। রাস্তায় তো ট্রিপ এহন কম। মোটরসাইকেল চালকরা বলছেন, সরকার অকটেন-পেট্রোলের পর্যাপ্ত মজুদ আছে বলে জানাচ্ছে। কিন্তু ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে বলা হচ্ছে মজুদ নেই। তাই সরবরাহও করা যাচ্ছে না। এভাবে তো হয় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ২০০-৫০০ টাকার তেল পাচ্ছি। এতে একদিন পরপরই তেলের প্রয়োজন হচ্ছে। রাজধানীতেই যদি এমন সংকট হয়, তাহলে তো প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। একটা সিস্টেম দাঁড় করানো দরকার। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। চালকরা আরও বলছেন, এই সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান দরকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা বাধ্য হয়ে সড়কে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকছেন। ফলে এর প্রভাব পড়ছে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর। তাই জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শহরের বাইরে বিকল্প ব্যবস্থা (বড় ডিপো বা আলাদা ফিলিং জোন) চালু করা হলে একদিকে চালকদের ভোগান্তি কমবে, অন্যদিকে রাজধানীর সড়কেও স্বাভাবিক গতি ফিরতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মত
এই সংকট শুধু রাস্তা বা অবকাঠামোর সমস্যা নয়; এটি মূলত দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও খারাপ অভ্যাসের ফল। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ থাকলেও, দেশের ভেতরে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে করতে হবে। গণপরিবহনকে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে, চালক ও মালিকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। এসব একসঙ্গে বাস্তবায়ন না হলে যানজট আরও খারাপ হবে।
সমস্যা সমাধানের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে নিয়মশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। বাসকে নির্ধারিত স্টপেজেই থামতে হবে, সড়কে যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করানো বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও সক্রিয় করতে হবে, যাতে মাঠপর্যায়ে নিয়ম বাস্তবেই কার্যকর হয়। তবে শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না; সেটা বাস্তবায়ন করাও বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারকে সড়ক, জ্বালানি ও জননিরাপত্তা; এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় এনে দ্রুত, কঠোর এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই রাজধানীর চলমান সংকট কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ বাংলানিউজকে বলেন, চলমান জ্বালানি সংকট ও এর ফলে সৃষ্ট যানজট পরিস্থিতি সামাল দিতে অড-ইভেন ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর হতে পারে। তার মতে, একটি দিন জোড় নম্বরের যানবাহন জ্বালানি নিতে পারবে, পরদিন বেজোড় নম্বরের যানবাহন এই সুযোগ পাবে।তিনি আরও বলেন, এই ব্যবস্থাটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। যেদিন জোড় নম্বরের যানবাহন জ্বালানি নেবে, সেদিন সড়কে শুধুমাত্র জোড় নম্বরের যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করার মতো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে একদিকে ফিলিং স্টেশনের চাপ নিয়ন্ত্রণে আসবে, অন্যদিকে সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজের মতে, আপৎকালীন এই ধরনের ব্যবস্থা সাময়িকভাবে সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে, তবে তা বাস্তবায়নে কঠোর তদারকি ও সমন্বয় জরুরি। পাশাপাশি তিনি ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক লাইন ব্যবস্থাপনাকে আরও শৃঙ্খলিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।তিনি বলেন, জ্বালানি গ্রহণের জন্য অপেক্ষমাণ যানবাহনগুলোকে অবশ্যই নির্ধারিত লাইনে রাখা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এসব গাড়ি যেন সড়কের মাঝখানে চলে এসে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এতে অন্তত সড়কের শৃঙ্খলা কিছুটা হলেও বজায় রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

ট্রাফিক বিভাগের ভাষ্য
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রমনা বিভাগের (এডিসি-ট্রাফিক) কাজী রোমানা নাসরিন বাংলানিউজকে বলেন, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো দিয়ে প্রতিদিনই প্রচুর যানবাহন প্রতিদিনই যাওয়া আসা করে। কমবেশি যানজট অথবা সিগন্যাল এমনিতেই প্রতিদিনের দৃশ্য। এর মধ্যে ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইনের কারণে জট আরও বেড়ে যায়। তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলো সড়কের একটি অংশ দখল করে নেয়। এতে সড়কে অন্যান্য যানবাহনের গতি কমে যায় এবং যানজট দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট আছে, সেটা আমরা বুঝি। কিন্তু তেলের লাইনের কারণে গণপরিবহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, বেশি সংখ্যক সাধারণ মানুষ আইন-কানুন মানতে চায় না, ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা বিনয়ের সঙ্গে সবাইকে নিয়ম মেনে চলতে বলছি। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে রশি টানিয়ে নির্দিষ্ট লেন করে দেওয়া হয়েছে, যাতে লাইন ঠিকভাবে থাকে। সেই লাইন যেন কেউ ভেঙে না দেয়, সেটিও নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি আমাদের নির্দেশনায় পেট্রোল পাম্পে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে লাইনের শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।তিনি আরও বলেন, তেলের লাইনে দাঁড়ানোর কারণে আমরা সরাসরি জরিমানা করছি না। তবে সড়ক তো জনগণের; তেলের জন্য লাইন দিয়ে অন্যান্য যানবাহন চলাচলে ব্যাঘাত ঘটাতে যেন কেউ না পারে সে চেষ্টাই ট্রাফিক পুলিশ করছে। তবুও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, অনেকেই নিয়ম মানছেন না। সেসব ক্ষেত্রে ভিডিও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে মামলা দেওয়া হচ্ছে।এডিসি কাজী রোমানা নাসরিন জানান, আমরা কঠোর হতে চাই না, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই কাজ করছি। সবাই যদি নিয়ম মেনে নির্ধারিত লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি নেন, তাহলে এই সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।






শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
আরও ১৪ সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব

আরও ১৪ সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব